এম.এ.কে.রানা::
মহেশখালীর মাতারবাড়ী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ডেলিভারি করাতে গিয়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে রোমানা বেগম (৩০) নামে এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নিহত রোমানা বেগম মাতারবাড়ী ইউনিয়নের সিকদার পাড়া এলাকার মোক্তার আহমদের কন্যা এবং কালারমারছড়া ইউনিয়নের আফজলিয়া পাড়া এলাকার আবু বক্করের স্ত্রী। সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতকসহ তিনি তিন সন্তানের জননী ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সন্তান প্রসবের নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসায় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ দিন আগে স্বামীর বাড়ি কালারমারছড়া থেকে বাবার বাড়ি মাতারবাড়ীতে আসেন রোমানা বেগম। পরিবারের সদস্যরা ধারণা করেছিলেন, বাবার বাড়িতে থাকলে তিনি বেশি যত্ন ও সেবা পাবেন।
গত শুক্রবার (৮ মে) বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে প্রসব ব্যথা শুরু হলে পরিবারের লোকজন দ্রুত তাকে মাতারবাড়ী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. সুলতানার কাছে রোগীকে নেওয়া হলেও তিনি হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না বলে দাবি পরিবারের।
পরিবারের অভিযোগ, পরে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অবস্থানরত খুরশিদা বেগম নামের এক নারী ডেলিভারির দায়িত্ব নেন। ডেলিভারি করানোর সময় অসাবধানতা ও ভুল চিকিৎসার কারণে রোমানা বেগমের জরায়ু কেটে যায়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
স্বজনদের দাবি, ঘটনার পরপরই রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়নি। দীর্ঘ ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে রেখে দেওয়া হয়। পরে অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে তাকে মাতারবাড়ী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার জরায়ু অপসারণ করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শারীরিক জটিলতার কারণে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে তাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাওয়ায় পুনরায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
অবশেষে টানা কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে রবিবার (১০ মে) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আইসিইউতে মারা যান রোমানা বেগম।
রোমানার মৃত্যুতে পরিবারে শোকের মাতম নেমে এসেছে। নবজাতক সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্বামী আবু বক্কর। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আমার স্ত্রী সুস্থ ছিল। শুধু সন্তান জন্ম দিতে হাসপাতালে নিয়েছিলাম। ভুল চিকিৎসার কারণে আজ আমার সন্তানরা মা হারিয়েছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কীভাবে প্রশিক্ষণবিহীন বা অনুমোদনহীন একজন নারীকে দিয়ে ডেলিভারির মতো ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়?
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ডেলিভারি রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হতো এবং খুরশিদা বেগম নিয়মিতভাবে ডেলিভারি করাতেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত খুরশিদা বেগমের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে ডা. সুলতানার বক্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর স্থানীয় সচেতন মহল স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সেবার মান, দায়িত্বে অবহেলা এবং অনিয়মের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।