
(বিপিসি) সূত্র অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকা করা হয়। অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে, যা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে স্থাপিত ভাসমান বয়া (এসপিএম) এবং সেখান থেকে মহেশখালী হয়ে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন-এই প্রকল্পের মূল কাঠামো। এর মাধ্যমে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে অপরিশোধিত তেল খালাস করে দ্রুত রিফাইনারিতে পাঠানো সম্ভব।
মহেশখালীতে প্রায় ১০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক পাম্পিং স্টেশন, ডিজেল জেনারেটর এবং ছয়টি বৃহৎ স্টোরেজ ট্যাংক। এর মধ্যে তিনটি ক্রুড অয়েল ট্যাংকের প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার কিলোলিটার এবং তিনটি ডিজেল ট্যাংকের প্রতিটির ধারণক্ষমতা ২৫ হাজার কিলোলিটার। সব মিলিয়ে দুই লাখ এক টন তেল মজুত রাখা সম্ভব-যা দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মজুত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বর্তমানে গভীর সমুদ্র থেকে বড় জাহাজে তেল এনে ছোট জাহাজে স্থানান্তর করে কর্ণফুলী চ্যানেল হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় এক লাখ টন তেল খালাস করতে সময় লাগে প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন।
অন্যদিকে, এসপিএম চালু হলে একই পরিমাণ তেল মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খালাস ও পরিবহন করা সম্ভব। এতে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, অপচয় এবং ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ তামিম বলেন,এটি এমন একটি প্রকল্প, যা দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় গেম-চেঞ্জার হতে পারত। অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে এতদিনে এটি চালু হয়ে যেত। বিলম্বের কারণে দেশ আর্থিক ও কৌশলগত দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন,পাইপলাইন পদ্ধতি আধুনিক, নিরাপদ ও কম ব্যয়বহুল। এত বড় বিনিয়োগের অবকাঠামো পড়ে থাকা অগ্রহণযোগ্য। কেন দেরি হচ্ছে তা খতিয়ে দেখে দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রকল্পটি চালু না হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে অপারেটর নিয়োগে জটিলতা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের আওতাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারির তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়।
প্রাথমিকভাবে বিশেষ আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই আইন বাতিল হওয়ায় নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করতে হয়। এই প্রশাসনিক পরিবর্তনই দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও অপারেটর নিয়োগ এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে প্রকল্পটি চালুর নির্দিষ্ট সময়সীমাও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোর্শেদা ফেরদৌস জানিয়েছেন,অপারেটর নিয়োগের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আমরা দ্রুত প্রকল্পটি চালুর জন্য কাজ করছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসপিএম প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্পটি চালু হলে বছরে প্রায় ৯০ লাখ টন ক্রুড অয়েল ও ডিজেল খালাস ও পরিবহন করা সম্ভব হবে। যদিও বর্তমান রিফাইনারি সক্ষমতায় এর প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা যাবে, তবুও ডিজেলের উচ্চ চাহিদার কারণে বছরে ৪৫ লাখ টনের বেশি ডিজেল পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।
দুই লাখ টনের মজুত সুবিধা ভবিষ্যতে কৌশলগত রিজার্ভ হিসেবে ব্যবহার করা গেলে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার সময় দেশ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো-অপারেটর সংকটের জটিলতায় আটকে আছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি অবকাঠামো। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কবে নাগাদ এই ‘নিষ্ক্রিয় স্বর্ণভাণ্ডার’ দেশের অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখতে পারবে?
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, এসপিএম প্রকল্পটি জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। স্থানীয় প্রশাসন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
তিনি আরো বলেন,এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। প্রকল্পটি চালু হলে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে অপারেশনাল সিদ্ধান্ত ও অপারেটর নিয়োগ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিষয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজবাহ উদ্দীন আরজু বলেন,আমরা শুনেছি এখানে বড় প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু এখনো এর কোনো বাস্তব সুবিধা দেখি না। যদি এটি চালু হতো, তাহলে হয়তো এলাকার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ত।
জেলে মোকতার হোসেন বলেন,সমুদ্রে বড় বড় কাজ হচ্ছে, কিন্তু আমাদের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। আমরা চাই এই প্রকল্প দ্রুত চালু হোক, যাতে এলাকার মানুষ কিছু উপকার পায়।
এসপিএম প্রকল্পের পরিচালক নাহিদ জামান বলেন, কিছু কারিগরি ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকটের কারণে এখনও প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে স্টোরেজে কিছু অপরিশোধিত তেল মজুদ করে সফলতা যাচাই করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো অপরিশোধিত তেল মজুদ করে তা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানো। সেখান থেকে তেল পরিশোধিত হয়ে দেশের জ্বালানি সংকট মেটাবে। আশা করছি, চলতি বছরে ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকট নিরসন করে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে পারব।