ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী–কুতুবদিয়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট থেকে মোট ছয়জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) কক্সবাজার জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল মান্নান তাঁর কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছেন।
পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ দাঁড়িপাল্লা, বিএনপির প্রার্থী আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ধানের শীষ, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জিয়াউল হক হাতপাখা, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) প্রার্থী এস এম রোকনুজ্জামান খান ট্রাক এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মাহমুদুল করিম পেয়েছেন লাঙ্গল প্রতীক।
এছাড়া ৮ দলীয় জোটের প্রার্থীকে হামিদুর রহমান আজাদকে সমর্থন জানিয়ে গত ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ওবায়দুল কাদের নদভী প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছেন।
প্রতীক বরাদ্দের মাধ্যমে এই আসনে নির্বাচনী প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের সমর্থন চাচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার-২ (মহেশখালী–কুতুবদিয়া) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২৭৯ জন। এর মধ্যে মহেশখালী উপজেলায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৯৮ জন এবং কুতুবদিয়া উপজেলায় ১ লাখ ৩ হাজার ৩৮১ জন ভোটার রয়েছেন।
আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় এলাকার রাজনীতি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দলের প্রার্থীরা এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির জহিরুল ইসলাম নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে মোহাম্মদ ইসহাক সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপির এটিএম নুরুল বাশার চৌধুরী এবং জুনের পুনঃনির্বাচনে আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি পুনরায় বিজয়ী হন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত এ.এইচ.এম. হামিদুর রহমান আজাদ বিজয়ী হন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত আশেক উল্লাহ রফিক টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও তীব্র। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, ইকোনমিক জোন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ একাধিক মেগা প্রকল্পের কারণে এই আসনের জাতীয় কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাতারবাড়ি বন্দর চালু হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় জাহাজে সরাসরি অংশগ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করবে। ফলে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
তবে স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রকল্পের সুফল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো এখনও যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়নি। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে কোহলিয়া নদীর নাব্যতা হ্রাস, জেলেদের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব এবং পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারা প্রার্থীদের কাছে দাবি রাখছেন—ইকোনমিক জোন ও মেগা প্রকল্পে স্থানীয়দের অগ্রাধিকারভিত্তিক চাকরি, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, দ্বীপাঞ্চলের টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জেলে ও কৃষকদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।
প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীরা নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ জোরদার করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় লড়াই নয়, বরং উন্নয়ন বনাম জনস্বার্থ রক্ষার পরীক্ষাও হবে। সংসদে নির্ধারিত হবে—মহেশখালী কেবল জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পের ভার বহন করবে, নাকি উন্নয়নের সুফল ভোগকারী একটি সমৃদ্ধ দ্বীপাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে।
মহেশখালী ও কুতুবদিয়াকে নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-২ আসনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হওয়ায় এবার এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনী লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট।