শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৪ অপরাহ্ন [gtranslate]
Headline
Headline
অনলাইন আরবী ভাষা প্রশিক্ষণে বিএমটিটিআই’র প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলেন মৌলানা ইয়াছিন কক্সবাজার-মহেশখালী সেতু: আদিনাথ মন্দিরের উত্তরাংশ থেকে চৌফলদণ্ডি হওয়ার সম্ভাবনা মহেশখালীতে মায়ের কিডনি দানে সন্তানের জীবনরক্ষা মহেশখালীতে বৈশাখী কবিতা পাঠ ও আড্ডা—সংস্কৃতির রঙে মুখর বন্ধু সভা হোয়ানকে জন্মসাল জালিয়াতি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ৮ হাজার কোটি টাকার এসপিএম ঘুমে, জ্বালানিতে লোকসান গুনছে দেশ সোনাদিয়ায় দুষ্কৃতিকারীদের হামলা, কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিদেশি পর্যটক উদ্ধার মহেশখালীতে অদক্ষ ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা সভা মহেশখালীতে ইউপি সদস্য রিমনের বাড়িতে পুলিশের অভিযান: অবৈধ কারেন্ট জাল উদ্ধার, মামলা দায়ের মহেশখালীতে পুকুরে ডুবে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু
জলবায়ু, জীবাণু ও জনজীবন: স্বাস্থ্য ও পরিবেশের তিনকোনা যন্ত্রণা, উন্নয়নের ছায়ায় বিষাক্ত নিঃশ্বাস
/ ২০৪ Time View
Update : শুক্রবার, ১ আগস্ট, ২০২৫, ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ
Oplus_16777216

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাত এখন এক সংকটময় মোড় পার করছে, যেখানে একদিকে জনস্বাস্থ্যের হুমকি বাড়ছে, অপরদিকে পরিবেশ দূষণের প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করছে যা বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যতের অন্তরায়। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার ফলে এই দুই খাতের সংকট দিনদিন ঘনীভূত হচ্ছে। অথচ এই দুটি খাত রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত ছিল। স্বাস্থ্য খাতে সরকারের উদ্যোগ যেমন কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প এবং ডিজিটাল হেলথ সল্যুশনের প্রয়াস রয়েছে, তেমনি বাস্তবায়নে রয়েছে সীমাহীন ঘাটতি। জনবল সংকট, ওষুধ সরবরাহে দুর্নীতি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল কাঠামো এবং গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্তের অভাব এই খাতকে বারবার ব্যর্থ করছে।
পরিবেশ খাতে যদিও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বেশ কিছু প্রশংসনীয় নীতি প্রণয়ন করেছে — যেমন “বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (BCCSAP)”, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন — তবে বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং স্থানীয় পর্যায়ের অজ্ঞতা বড় বাধা। বহু উন্নয়ন প্রকল্পেই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) হয় লোকদেখানো মাত্র।

ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আজিমপুর বা মিরপুর এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, কীভাবে নিয়মিত ময়লা পরিষ্কার না হওয়ায় ঘর থেকে অফিস পর্যন্ত যাত্রা এক বিষাক্ত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। বাতাসে ধুলাবালি, নালায় জমে থাকা প্লাস্টিক, আর সড়কে উন্মুক্ত নর্দমা মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। এখন এসব দৃশ্য আর অস্বাভাবিক মনে হয় না। অথচ রাষ্ট্রীয় নীতিতে ‘পরিবেশ সুরক্ষা’ এবং ‘স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ’ দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চারিত।
সাভার, নারায়ণগঞ্জ কিংবা গাজীপুরে শিল্পকারখানা এলাকার নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে নদীর পানি দিয়ে কৃষি বা মাছ চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ধলেশ্বরী নদীর পাশে থাকা অনেক চাষি এখন পানি সংগ্রহ করতে কয়েক কিলোমিটার দূরে যান, কারণ কলকারখানার কালো বর্জ্য নদীর রঙ, গন্ধ আর জীবন—সব কেড়ে নিয়েছে। সেখানকার শিশুদের মধ্যে চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে, কিন্তু স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই প্রয়োজনীয় ডাক্তার কিংবা ওষুধ।

অন্যদিকে, রংপুরের পীরগঞ্জ কিংবা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এলাকায় এখনো বাচ্চাদের ডায়রিয়া, টিকা গ্রহণ না করা এবং সেফ পানি না পাওয়ার মতো সমস্যাগুলো আধুনিক বাংলাদেশের ছায়াতলে বসবাস করেও নিরসন হয়নি। অনেক উপজেলায় নেই কোনো এমবিবিএস ডাক্তার, নেই নার্স, নেই পর্যাপ্ত ওষুধ—আর সরকারি হাসপাতালে যে আসে, তারা চিকিৎসার বদলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রানির সাক্ষী হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রেই পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক নেই। অথচ একই সঙ্গে রাজধানীতে প্রাইভেট হাসপাতালের সংখ্যা ও খরচ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব।

পরিবেশ ও স্বাস্থ্য খাতের এই সংকটের পেছনে যেমন রয়েছে বাজেট স্বল্পতা, তেমনি রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি। প্রতিটি নির্বাচনে ‘স্বাস্থ্যসেবা’ ও ‘পরিবেশ রক্ষা’ প্রতিশ্রুতি হিসেবে থাকলেও বাস্তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উন্নয়ন বলতে বোঝেন রাস্তা বানানো, আর সরকারের বরাদ্দ যায় পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পে—যা গণমাধ্যমে প্রচারযোগ্য হলেও জনগণের মৌলিক সমস্যা সমাধানে অপর্যাপ্ত। অথচ পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি এসব উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে উঠেছে।

বিদ্যমান নীতিমালাগুলো যেমন—বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনা (BCCSAP), স্বাস্থ্যনীতি ২০১১—কাগজে-কলমে চমৎকার হলেও বাস্তবে তা বারবার প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতিতে মুখ থুবড়ে পড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের নেতৃত্বে স্বল্প পরিসরে কিছু পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা মূলক উদ্যোগ দেখা গেলেও তা এখনও ধারাবাহিক রূপ নিতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ বিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য কিংবা মেডিকেল শিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ সীমিত, এবং শিক্ষার্থীদের কমিউনিটি পর্যায়ে সম্পৃক্ততার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ স্বাস্থ্য ও পরিবেশ এই দুটি ক্ষেত্রেই তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষাঙ্গনের দায়িত্ব কেবল পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, মাঠ পর্যায়ের কাজ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় গড়ে তোলার দিকেই মনোনিবেশ করা উচিত। বিভিন্ন বিশ্ববদ্যালয়ে পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য নিয়ে তরুণ গবেষকরা কাজ করছেন, যদিও অর্থের অভাবে তাদের অনেক গবেষণাই থেমে যাচ্ছে মাঝপথে। সরকার চাইলেই এই তরুণদের সঙ্গে মিলে টেকসই পরিবর্তন ঘটাতে পারে। যেমন, উপজেলা পর্যায়ে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক তরুণদের নিয়ে গঠন করা যেতে পারে ‘জেলা সচেতনতা টাস্কফোর্স’, যার নেতৃত্বে থাকবে শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাংবাদিকদের সমন্বয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাকে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের সুযোগ দিলে কেবল ডেটা নয়, সমাধানও আসবে ঘরের ভেতর থেকেই। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যেমন জলবায়ু তহবিল বা স্বাস্থ্য উন্নয়ন প্রকল্প, সেগুলোও বাস্তবায়ন হলে দেশের প্রতিটি এলাকায় টেকসই প্রভাব ফেলা সম্ভব।

অপরদিকে জাতীয় পর্যায়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, এবং জনমুখী বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত না হলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতের উন্নয়ন কেবল ভাষণেই আটকে থাকবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ জলবায়ু তহবিল, SDG অংশগ্রহণ, WHO-র সঙ্গে চুক্তিসহ বেশ কিছু কার্যক্রমে যুক্ত হলেও এই সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিয়ে রয়েছে স্বচ্ছতার অভাব। সমন্বিতভাবে বলতে গেলে, দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাত আজ যেভাবে জরাজীর্ণ কাঠামোয় দাঁড়িয়ে আছে, তা সংস্কার না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জর্জরিত করতে হবে দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, দুর্বিষহ পরিবেশ ও অনিরাপদ জীবনের ঝুঁকিতে।

এই সংকট উত্তরণের জন্য দরকার—শিক্ষাঙ্গনের গবেষণা-নির্ভর অংশগ্রহণ, তরুণ সমাজের নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক নেতাদের আন্তরিক ও সম্মিলিত প্রয়াস। রাষ্ট্র যদি এখনই টেকসই উদ্যোগ না নেয়, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাবে একটি অসুস্থ সমাজ এবং বিপর্যস্ত পরিবেশ—যার দায় কোনো একক গোষ্ঠীর নয়, বরং আমাদের সবার। তাই, আজ প্রয়োজন মুখস্থ নীতিমালা নয়, বরং বাস্তবতানির্ভর প্রয়োগ—যেখানে গ্রামের মানুষটি অন্তত জানবে কীভাবে পরিষ্কার পানি পাবে, শহরের শ্রমজীবী মানুষটি জানবে কোথায় কম খরচে চিকিৎসা পাবে, এবং প্রতিটি নাগরিক জানবে যে, তারা নিঃশ্বাস নিচ্ছে বিষ নয়, বাতাস।

লেখক: শাহরিয়ার মোহাম্মদ ইয়ামিন
যুগ্ম-সদস্য সচিব, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ
সদস্য, স্বাস্থ্য উপকমিটি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Our Like Page