নাছির উদ্দিন সোহেল
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আলোচনায় এসেছে। নিজের শরীরের একটি কিডনি দান করে সন্তানের জীবন বাঁচিয়েছেন এক অসাধারণ মা—নাছিমা বেগম। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও মমত্ববোধের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো সমাজের সামনে।
জানা যায়, মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ঘোনারপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাফেজ জসিম উদ্দিন দীর্ঘ ছয় মাস ধরে জটিল কিডনি রোগে ভুগছিলেন। ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। এক পর্যায়ে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চললেও অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি।
চিকিৎসকরা একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, জসিম উদ্দিনের জীবন বাঁচাতে হলে দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। এই সংবাদে পরিবারে নেমে আসে উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার ছায়া। অর্থনৈতিক চাপ, উপযুক্ত দাতা খোঁজা—সব মিলিয়ে পরিবারটি পড়ে যায় চরম সংকটে।
এমন কঠিন সময়ে মায়ের হৃদয়ই হয়ে ওঠে সন্তানের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। জসিম উদ্দিনের মা নাছিমা বেগম কোনো দ্বিধা না করে নিজের একটি কিডনি ছেলেকে দান করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, তিনি কিডনি দানের জন্য উপযুক্ত।
পরবর্তীতে ঢাকার একটি বিশেষায়িত কিডনি হাসপাতালে মা ও ছেলেকে ভর্তি করা হয়। অভিজ্ঞ চিকিৎসক দলের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর গত ১৪ এপ্রিল সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
অস্ত্রোপচার শেষে চিকিৎসকরা জানান, অপারেশন সফল হয়েছে এবং মা ও ছেলে দু’জনই শঙ্কামুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তারা হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
এই ঘটনার পর স্থানীয় এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী মায়ের এই ত্যাগকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন। অনেকেই বলছেন, আধুনিক সময়ে যেখানে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে, সেখানে নাছিমা বেগমের এই আত্মত্যাগ আমাদের মানবিকতার মূল শিক্ষা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এটি শুধু একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত ঘটনা নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন, মমতা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একজন মা তার সন্তানের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন—এই ঘটনা তারই জীবন্ত প্রমাণ।
এদিকে, অপারেশন শেষে পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে মা ও সন্তানের দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, এই কঠিন সময়ে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা ও দোয়া তাদেরকে সাহস জুগিয়েছে।
সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব আরও জোরদার করবে। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যে এখনো বেঁচে আছে—নাছিমা বেগম তারই এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবেন দীর্ঘদিন।