মিষ্টি পাতায় স্বপ্ন বুনে লোকসানের বোঝা চাষির কাঁধে
কক্সবাজার জেলার দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে মিষ্টি পান চাষ দীর্ঘদিন ধরে একটি লাভজনক কৃষিখাত হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রমজান জুড়ে বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় পান চাষিরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও পান বিক্রি করে সেই অনুযায়ী লাভ না হওয়ায় অনেক চাষিই এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন। এতে করে এলাকার ঐতিহ্যবাহী এই চাষাবাদ ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
মহেশখালীর বড় মহেশখালী, গোরকঘাটা, শাপলাপুর, কুতুবজোমসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পান বরজে প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করছেন চাষিরা। তবে বাজারে গিয়ে তারা আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না। বর্তমানে প্রতি বিরা পান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। অথচ এক বিরা পান উৎপাদন করতে যে পরিমাণ খরচ হয়, সেই তুলনায় এ দাম খুবই কম বলে জানান চাষিরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পান বরজ তৈরিতে প্রচুর খরচ হয়। বাঁশ, খুঁটি, পাতা, দড়ি, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচসহ নানা উপকরণে ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। একজন চাষির হিসেবে, এক একর জমিতে পান চাষ করতে গড়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু সেই তুলনায় পান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় পান চাষি নুরুল আমিন বলেন, আমরা অনেক আশা নিয়ে পান চাষ করি। কিন্তু বাজারে যে দাম পাই, তাতে খরচই উঠে না। প্রতিদিন শ্রমিকের মজুরি, সার ও অন্যান্য খরচ বাড়ছে। এবার যদি এমন পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে আগামী বছর অনেকেই পান চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
ছোট মহেশখালীর পান চাষি আবদুল করিম জানান, পান বরজ রক্ষণাবেক্ষণ খুবই শ্রমসাধ্য কাজ। সামান্য অবহেলা হলেই রোগবালাই দেখা দেয় এবং পুরো বরজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এত ঝুঁকি নিয়ে চাষ করেও ন্যায্য দাম না পেলে চাষিদের পক্ষে এই পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
চাষিদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই তারা পান বিক্রির ক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় বাজার থেকে পান সংগ্রহ করে এসব মধ্যস্বত্বভোগী বেশি দামে অন্যান্য এলাকায় বিক্রি করলেও কৃষকের হাতে সেই লাভের অংশ খুব একটা আসে না।
এছাড়া মহেশখালীতে পান সংরক্ষণের কোনো আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় চাষিরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। পান দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব না হওয়ায় চাষিরা বাধ্য হয়ে দ্রুত বিক্রি করতে চান। ফলে বাজারে যখন দাম কম থাকে তখনও তাদের কম দামে পান বিক্রি করে দিতে হয়।
মহেশখালীর মাটি ও আবহাওয়া মিষ্টি পান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে।
এ বিষয়ে চাষিরা সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে,কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পান সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করা, পান বাজারে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয়ভাবে পান সংরক্ষণের জন্য হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণাগার স্থাপন।
চাষিরা বলেন, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পান চাষ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এতে শুধু কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং এলাকার অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহেশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল গফফার বলেন, মহেশখালীতে মিষ্টি পান চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমানো এবং আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের বিষয়ে কৃষি বিভাগ নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি পান সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে চাষিরা আরও বেশি লাভবান হবেন।
আপনার মতামত লিখুন :
Leave a Reply
More News Of This Category


