সমুদ্রের নীল বিস্তৃতি আর পাহাড়ের সবুজ ঢেউয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কক্সবাজার জেলার একমাত্র দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী। প্রকৃতি এখানে অকৃপণ,পাহাড়, সমুদ্র, বন, বালুকাবেলা আর ইতিহাসের স্তর মিলিয়ে এই দ্বীপ যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। অথচ হাজার বছরের ইতিহাস ও বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মহেশখালী আজও অবহেলা, অব্যবস্থাপনা আর দায়সারা পরিকল্পনার ভারে নুয়ে পড়েছে।
ইতিহাস ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হাজার হাজার বছর আগে নদীর পলি আর বঙ্গোপসাগরের ভাঙা–গড়ার ধারাবাহিকতায় মহেশখালীর জন্ম। একসময় এটি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নদী ও সাগরের প্রবল স্রোতে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্বীপে রূপ নেয়। পাহাড় ও সমুদ্র একসঙ্গে থাকা বাংলাদেশের বিরল ভূপ্রকৃতির অন্যতম নিদর্শন এই মহেশখালী।
‘মহেশখালী’ নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ইতিহাস ও বিশ্বাস। মহেশখালীর ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক শিবচূড়ায় অবস্থিত আদিনাথ মন্দির। প্রায় হাজার বছরের পুরোনো এই মন্দির শুধু একটি উপাসনালয় নয়, এটি মহেশখালীর আত্মার অংশ। লোককথা অনুযায়ী, পাহাড়চূড়ায় শিবলিঙ্গ আবিষ্কারের পর থেকেই এখানে শিবের আরাধনা শুরু হয়।
প্রতি বছর শিবচতুর্দশী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও প্রতিবেশী দেশ থেকেও হাজারো পূণ্যার্থী এখানে আসেন। পাহাড় বেয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপ অনেকের কাছে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনা। কিন্তু এত বড় ধর্মীয়

হাসবিদ মনে করেন, শিবের আরেক নাম ‘মহেশ’ থেকেই এই জনপদের নামকরণ। আবার কেউ কেউ বলেন, প্রাচীন মাঘ বা বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রভাবও এই নামের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
পর্যটন কেন্দ্র হয়েও মন্দির এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, বিশ্রামাগার, শৌচাগার ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব দীর্ঘদিনের অভিযোগ।
মহেশখালী দেখতে আসার শুরুতেই পর্যটকদের পড়তে হয় ভোগান্তিতে। কক্সবাজারের ৬ নম্বর ঘাটে টোল, এরপর সমুদ্র পেরিয়ে মহেশখালী ঘাটে আবার আলাদা টোল। একই যাত্রায় দ্বিগুণ টোল আদায় পর্যটকদের হতাশ করে তুলছে।
ভারত মেঘালয় রাজ্য থেকে আদিনাথ দর্শন করতে আসা সুমিত চক্রবর্তী বলেন,একই যাত্রায় দুই জায়গায় টোল দিতে হয়—এটা মোটেও পর্যটনবান্ধব নয়। থাকার ভালো ব্যবস্থা থাকলে মহেশখালীতে আরও সময় কাটাতাম।
দিনভ্রমণের বাইরে যারা মহেশখালীতে সময় কাটাতে চান, রাত নামলেই তাদের সামনে আসে কঠিন বাস্তবতা। পুরো উপজেলায় পর্যটকদের জন্য ভালো মানের কোনো আবাসিক হোটেল নেই। নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসনের অভাবে পর্যটকরা একদিনেই ফিরে যেতে বাধ্য হন।
ব্যবসায়ী আরিফ উদ্দিন বলেন,পর্যটনের সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় এখানে মানসম্মত হোটেলে বিনিয়োগ করতে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এতে পর্যটকও থাকে না, আমরাও লাভবান হই না।
মহেশখালী বিচ্ছিন্ন দুই দ্বীপ ধলঘাটা ও মাতাবাড়ি সমুদ্র সৈকত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। জনসমাগমহীন শান্ত বালুকাবেলা, নীল সমুদ্র আর খোলা আকাশ,সবই আছে। কিন্তু নেই পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা তথ্যকেন্দ্র।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহারিয়ার বলেন,পর্যটক বাড়লে আমাদের আয় বাড়ত। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা না থাকায় মানুষ আসে না।
মহেশখালীর দক্ষিণে সোনাদিয়া দ্বীপ,এক সময়ের সম্ভাবনার প্রতীক। ম্যানগ্রোভ বন, পাখির আবাস আর শান্ত সমুদ্র একে ইকো-ট্যুরিজমের জন্য আদর্শ করে তুলেছে। কিন্তু সুস্পষ্ট নীতিমালা ও সংরক্ষণ পরিকল্পনার অভাবে দ্বীপটি আজ অনিশ্চয়তার মুখে।
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতা আবু বক্কর ছিদ্দিক সতর্ক করে বলেন,সোনাদিয়াকে ইকো-ট্যুরিজম জোন হিসেবে গড়ে না তুললে এই দ্বীপ তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারাবে।মানুষের জীবন আর না-পাওয়া সম্ভাবনা পর্যটন বিকশিত না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় মানুষ। জেলে, মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।বৃদ্ধ শফি মাঝির কণ্ঠে শোনা যায় আক্ষেপ,দরিয়া (সমুদ্র) তো আছে, কিন্তু ভাগ্য বদলানোর পথ নাই।
মহেশখালী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর খাইর হোসেন বলেন,মহেশখালীর পর্যটন উন্নয়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো বলেও তৎকালীন সময়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন,পর্যটন সুবিধা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। ঘাট, সৈকত ও আবাসন–সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।।মহেশখালী আজ ইতিহাস আর সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক দ্বীপ। প্রকৃতি তার সবটুকু দিয়েছে বহু আগেই। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনা, সদিচ্ছা আর দায়বদ্ধতা। নতুবা ইতিহাস লিখবে,একটি দ্বীপ ছিল, যার পাহাড় ছিল, সমুদ্র ছিল, মন্দির ছিল, কিন্তু যত্ন ছিল না।মহেশখালী আজও অপেক্ষায়,অবহেলার অবসান আর সম্ভাবনার বাস্তব রূপ দেখার।