
মুহাম্মদ হেদায়ত উল্লাহ
কবি ও প্রাবন্ধিক
১. ‘ফাল্গুন’ (প্রকাশক: তারুণ্য ৭১; প্রকাশকাল: মে-২০২৫, বৈশাখ-১৪৩২ বঙ্গাব্দ) কেবল একটি সাহিত্য সংকলন নয়, এটি কালারমারছড়া ইউনিয়নের উত্তর নলবিলা ও তৎসংলগ্ন এলাকার শিশু-কিশোরদের চিন্তা, অনুভূতি এবং কল্পনাশক্তিকে সৃজনশীলভাবে প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম। সম্পাদক মণ্ডলীরা (মোহাম্মদ হোসেন (বিধু), মুহম্মদ হেলাল উদ্দিন ফারুকী এবং কাব্য সৌরভ) এই পত্রিকাটি প্রকাশের মাধ্যমে শিশুদের লুকানো সম্ভাবনাগুলিকে উদ্ঘাটন করতে চেয়েছেন। ছাপা অক্ষরে নিজের লেখা বই আকারে হাতে পাওয়ার আনন্দ তাদের মধ্যে সাহিত্য চর্চায় গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করবে বলেই বিশ্বাস করেছেন।
২. এই উদ্যোগের মূল শক্তি ছিল এর মুক্ত ও স্বাধীন সৃজনশীলতার দর্শন। শিশুদের বলা হয়েছিল ’যা মনে চায়’ তা লিখতে বা ছবি আঁকতে; তাদের অনুসন্ধিৎসু মনে কোনো পূর্বশর্তের সীমানা বসানো হয়নি। এর ফলে রচনাগুলো শিশুদের কল্পনা থেকে উঠে আসা ‘বিশুদ্ধতম সত্য; মাটির মতো সরল’ হয়ে উঠেছে। এই সরলতা ও স্বাধীনতাতেই রয়েছে শিশু-সাহিত্যের সৃষ্টিশীলতার আসল পরশপাথর। পত্রিকাটির প্রতিটি রচনা, যেন একেকটি শিশুর পরাবাস্তব জাদুর নৌকা, যা পাঠককে এক অচেনা পৃথিবীতে নিয়ে যায়।
৩.’ফাল্গুন’-এর সূচীপত্র (কবিতা, গল্প, ভ্রমণকাহিনী‚ চিত্রাঙ্কন ও বিবিধ) শিশুদের বহু-মাত্রিক সংবেদনশীলতাকে তুলে ধরেছে। তাদের লেখায় প্রকৃতিপ্রেম যেমন রয়েছে, তেমনই উঠে এসেছে পরিবেশ দূষণের দিকগুলো, পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব, বন্ধুত্ব ও মান-অভিমানের মুহূর্ত, এমনকি ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিষয়াদিও।
৪. কবিতার স্তবক বিশ্লেষণ:
সংকলনটির কবিতা অংশে বিভিন্ন স্তবকে শিশুদের পরিবেশ ও সমাজ-সচেতন মননের গভীর ছাপ পাওয়া যায়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতার স্তবক বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
‘সে জুলাই আর না আসুক’ (নিষ্মা মণি, নবম শ্রেণি):
নিষ্মা মণি তার কবিতায় চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের প্রতি তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন। যেমন—
“সেই জুলাই আর না আসুক
যেই জুলাই রক্ত গঙ্গা বয়েছিল।
সেই জুলাই আর না আসুক
যেই জুলাই জাতির বুকে আর্তনাদ
সেই জুলাই আর না আসুক
যেই জুলাই স্বৈরাচার হাসে।”
এই স্তবকগুলোতে, একজন কিশোরী লেখক অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে চব্বিশের গণহত্যার ভয়াবহ ও রক্তাক্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের আকুতি জানিয়েছেন, যা তার সমাজ-সচেতন মন ও ঐতিহাসিক জ্ঞানকে প্রতিফলিত করে।
‘মানুষ’ (মৈত্রী বড়ুয়া, নবম শ্রেণি):
মৈত্রী বড়ুয়ার কবিতাটি সার্বজনীন মানবতার বার্তা বহন করে। তিনি মানুষে মানুষে বিভেদ ও দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—
“আমরা সবাই মানুষ,
তাহলে কেন আমাদের মধ্যে বিভেদ রয়েছে?
আমাদের সবার রক্তের রং কি লাল নয়?
আমরা সবাই কি রক্ত-মাংসে গঠিত নই?
আমরা মিলে মিশে কি হতে পারি না একতাবদ্ধ?
মানুষ হয়ে মানুষের বিপদে পাশে থাকতে পারি না?”
এই সরল প্রশ্নগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একতা, সাম্য ও অহিংসার প্রতি শিশুদের সহজাত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।
‘দূষণ’ (মিফতাহুল জান্নাত তাফসি, অষ্টম শ্রেণি):
মিফতাহুল জান্নাত তাফসি সরাসরি পরিবেশ দূষণকে ‘চিরশত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি দূষণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন—
“দূষণ মোদের চিরশত্রু
জীবনের প্রতিকূল
যত প্রাণী বাস করে
জল-চর উভয়কুল।
যেথায়-সেথায় কারখানা আর
যানবাহনের ধোঁয়া,
গন্ধ সয়ে-নাক চেপে
করতে হয় আসা যাওয়া।”
লেখিকা জল, স্থল ও বায়ু দূষণের বাস্তব চিত্র এঁকেছেন এবং এর ফলে সৃষ্ট হৃদরোগ ও মহামারির মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন। শেষে তিনি সচেতনতার মাধ্যমে ‘শোভন’ জীবন গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
‘শীতকাল’ (কামরুল হাসান রিফাত) ও ‘বৃষ্টি’ (হাছনাইন):
ঋতু-ভিত্তিক কবিতাগুলোতে প্রকৃতির দ্বৈত রূপ, অর্থাৎ আনন্দ ও সংগ্রামের চিত্র রয়েছে।
‘শীতকাল’ কবিতায় কবি লিখেছেন—
“পাড়া প্রতিবেশী সবাই মিলে / গোল হয়ে বসে যায়, / কেউ একজন বলে- / আগুন পোহাতে যা পারিস নিয়ে আয়।”
এই স্তবকটি শীতকালে গ্রামীণ জীবনে একসাথে আগুন পোহানোর মাধ্যমে উষ্ণতা খোঁজার চিরায়ত আনন্দ ও সামাজিক বন্ধনকে তুলে ধরে।
‘বৃষ্টি’ কবিতায় কবি লিখেছেন—
“বর্ষা এলে / গ্রামের মানুষেরা পড়ে ভিষণ বিপদে। / বর্ষার ঝড়ে / সোনালি ফসল হারিয়ে; / কৃষকেরা কাঁদে কপালে হাত দিয়ে।”
হাছনাইন-এর লেখায় বর্ষার বিপন্নতা, কৃষকের ফসলহানি এবং জীবনধারণের সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে।
৫. গল্প অংশে ‘ভূতের রাত’ বা ‘ভবিষ্যতের পৃথিবী’-এর মতো পরাবাস্তব বা বৈজ্ঞানিক কল্পজগতের কাহিনি স্থান পেয়েছে, যা তাদের কল্পনাবিলাসকে প্রকাশ করে। ভ্রমণকাহিনীতে তারা কক্সবাজার, সাফারি পার্ক, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য এলাকাসহ নানা দৃষ্টিনন্দন জায়গায় ভ্রমণের মুগ্ধতা বর্ণনা করেছে।
সম্পাদকগণ প্রায় আটশো’র অধিক লেখা থেকে মৌলিক লেখা বাছাই করার চেষ্টা করেছেন। কিছু লেখার মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল বানান, বিরাম চিহ্ন ও বাক্য গঠনে পরিমার্জন করে সেগুলোকে প্রাঞ্জল ও সহজপাঠ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে।
৬. ‘ফাল্গুন’ সাহিত্য পত্রিকা শিশুদের সৃজনশীলতা, চিন্তা এবং অনুভূতি প্রকাশের এক দারুণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এটি এই ছোট্ট মানুষগুলোর পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত হওয়ার একটি ‘প্রতিফলিত আয়নার’ মতো। এই প্রকাশনা একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে, যা শিশুদের সাহিত্য চর্চা এবং তাদের চিন্তা ও কল্পনাকে বৃহত্তর বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার এক কার্যকর সূচনা-বিন্দু হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদী।


