
এম আবদুল মান্নান
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ মহেশখালী। পাহাড়, সমুদ্র, নদী আর জীববৈচিত্র্যের অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই দ্বীপে প্রায় দশ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। কিন্তু দ্বীপটির প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ প্যারাবন আজ সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে।
বিগত কয়েক দশক ধরে পদ্ধতিগতভাবে মহেশখালীর প্যারাবন কেটে তৈরি করা হচ্ছে চিংড়ির ঘের, লবণক্ষেত কিংবা বসতি। শত শত একর বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে মূল চালিকা শক্তি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী। স্থানীয় ও বাইরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মুনাফার আশায় একের পর এক ঘের নির্মাণ করছে। অথচ প্রকৃত ক্ষতির বোঝা বইতে হচ্ছে দ্বীপের সাধারণ মানুষকেই।
প্যারাবন মহেশখালীর জন্য শুধু বৃক্ষবেষ্টনী নয়; এটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে এক অদৃশ্য বাঁধ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা সুনামি—যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় এই বনই দেয় প্রথম প্রতিরোধ। প্যারাবন নিধনের ফলে ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে তবে ভবিষ্যতে মহেশখালীর ভৌগোলিক অস্তিত্বই সংকটে পড়তে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও তা সাময়িক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। উচ্ছেদ হওয়া জায়গায় অল্প সময়ের মধ্যে আবার নতুন ঘের গড়ে ওঠে। বড় দখলদার ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অথচ সাধারণ দিনমজুর বা দরিদ্র মানুষ যদি জ্বালানির জন্য সামান্য কাঠ সংগ্রহ করতে যায় তবে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এই দ্বৈত নীতি স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।
বর্তমানে মহেশখালীর প্রায় পাঁচ শতাংশ প্রভাবশালী পরিবারের হাতে প্যারাবন কেটে তৈরি জমি পুঞ্জীভূত। একই পরিবার বা গোষ্ঠী ঘুরেফিরে এসব জমি দখল করছে। এতে দ্বীপবাসীর একাংশ কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে—যদি প্যারাবন নিধন অবৈধ হয় তবে অপরাধীরা কেন গ্রেফতার হচ্ছে না? আর যদি বৈধ হয় তবে কেন পুরো জনগোষ্ঠীর মাঝে জমি সমানভাবে বণ্টন করা হচ্ছে না?
প্যারাবন ধ্বংসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু পরিবেশগত নয়; সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি ভয়াবহ। মৎস্য সম্পদ হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি, কৃষিজমির ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাসে ভিটেমাটি হারানো—সব মিলিয়ে স্থানীয় জনজীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দরের চাপ। সব মিলিয়ে মহেশখালী এক বহুমুখী সংকটের দিকে এগোচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ অপরিহার্য—অবৈধভাবে প্যারাবন কেটে তৈরি ঘের উচ্ছেদ এবং পুনরায় গড়ে ওঠা রোধে ধারাবাহিক নজরদারি প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় টেকসই পুনঃবনায়ন ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার।স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকা, যেমন পরিবেশবান্ধব মৎস্যচাষ ও ইকো-ট্যুরিজম। ভূমি ও বনজ সম্পদের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন
মহেশখালী শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি বাংলাদেশের উপকূলের প্রতিরক্ষা প্রাচীর। প্যারাবন ধ্বংস মানে কেবল কিছু গাছ কাটা নয়; এটি সমুদ্র উপকূলের জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া। আজই যদি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম হয়তো এই দ্বীপকে হারাতে বাধ্য হবে।


