
শেখ আব্দুল্লাহ
বাংলাদেশের সর্বত্র যখন সনাতনী ধর্মাবলম্বীরা শারদীয় দুর্গাপূজা প্রতিমা নির্মাণ, পূজা-অর্চনা এবং বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মহা উৎসব পালন করেন, তখন কক্সবাজার জেলার দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। এখানে দুর্গাপূজার রীতি সারা দেশের তুলনায় আলাদা, অনন্য এবং শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী।
শারদীয় দুর্গোৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে দেবী দুর্গার পূজা। সারা দেশে প্রতিমা নির্মাণ করে সাজানো হয় মণ্ডপ, পূজার আয়োজন করা হয় জমকালোভাবে। বিজয়া দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় এই উৎসব।
কিন্তু মহেশখালী উপজেলায় প্রতিমা নির্মাণ বা বিসর্জনের কোনো আয়োজন নেই। এখানকার সনাতনী সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী—মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরে স্বয়ং দেবী দুর্গার অবস্থান বিদ্যমান। তাই প্রতিমা নির্মাণের প্রয়োজন অনুভূত হয় না।
মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির কেবল এই উপজেলাতেই নয়, গোটা ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহাসিক মন্দির। পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে বহু শতাব্দী ধরে চলে আসছে পূজা-অর্চনার ধারা। এখানে প্রতিবছর শিবচতুর্দশী মেলা বসে, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো ভক্ত সমবেত হন।
স্থানীয় বিশ্বাস মতে, আদিনাথে দেবী দুর্গা ও মহাদেব উভয়েই ‘স্বয়ং প্রতিষ্ঠিত’। তাই এ অঞ্চলে আলাদা করে প্রতিমা গড়ার প্রয়োজন নেই।
মহেশখালীতে দুর্গোৎসব পালিত হয় **‘ঘুড় পূজা’**র মাধ্যমে। এখানে প্রতিমার পরিবর্তে প্রতীকী আকারে ঘুড় বা প্রতীকী কাঠামো পূজা করা হয়। পূজা শেষে সেই ঘুড় নিজ নিজ বাড়ির পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়। স্থানীয়রা মনে করেন, এভাবেই দেবীর আরাধনা পূর্ণতা পায় এবং অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটে।
এই রীতি শুধু মহেশখালীতে প্রচলিত। ফলে এটি একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সনাতনী ধর্মাবলম্বীরা ও মহেশখালী পৌর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রোপন জানান, মহেশখালীতে প্রতিমা পূজা না হলেও দুর্গোৎসবের আনন্দ কোনোভাবেই কমে না। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা একত্রিত হয়ে পূজা-অর্চনা, ভক্তিগীতি, প্রসাদ বিতরণ এবং ধর্মীয় আচার পালন করেন। সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এই উৎসব।
অন্যদিকে, প্রতিমা নির্মাণ ও বিসর্জনের ঝামেলা না থাকায় এ অঞ্চলে দুর্গোৎসব অপেক্ষাকৃত সহজ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়। শিশু-কিশোররা যেমন আনন্দে মেতে ওঠে, তেমনি প্রবীণরা আধ্যাত্মিক ভক্তির আবহে নিজেকে নিমগ্ন রাখেন।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, মহেশখালীতে এই প্রথা বহু পুরনো হলেও আধুনিক প্রভাব ও প্রজন্মের পরিবর্তনের কারণে কিছুটা পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। অনেক তরুণ-তরুণী দেশের অন্যান্য অঞ্চলের পূজার মতো প্রতিমা নির্মাণ দেখতে চান। তবে প্রবীণরা মনে করেন, আদিনাথ মন্দিরের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে এ অঞ্চলের ভিন্নধর্মী পূজার ধারা অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি।
যেখানে সারাদেশে বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের উৎসব চলে নদী-খাল-বিল বা সমুদ্রের তীরে, সেখানে মহেশখালীতে নেই কোনো প্রতিমা বিসর্জন। বরং রয়েছে ঘুড় পূজার শান্ত রীতি। এই কারণে মহেশখালীর দুর্গোৎসব আলাদা পরিচয়ে চিহ্নিত হয়ে আসছে যুগের পর যুগ।


