
শেখ আব্দুল্লাহ
সাগর আজও আছে-নীল বিস্তৃত বুক মেলে, ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ে তীরে, বাতাসে লবণের গন্ধ ভেসে আসে-তবু সেই সাগর আজ যেন নীরব। মহেশখালীর উপকূলে এখন আর জাল ফেলার শব্দ নেই, নেই নৌকার ইঞ্জিনের গর্জন, নেই জেলেদের সেই চেনা হাঁকডাক। আছে শুধু নিস্তব্ধতা-এক ভারী, বুক চেপে ধরা নিস্তব্ধতা।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলজুড়ে এখন দৃশ্যটা একটাই-কাদামাটির বুকে সারি সারি নৌকা থেমে আছে, যেন ক্লান্ত জীবনের দীর্ঘ নিঃশ্বাস। শুকিয়ে যাওয়া জালগুলো বালুর ওপর ছড়িয়ে আছে, বাতাসে দুলছে নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে। এই দৃশ্য শুধু একটি মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার নয় এটি একটি জীবিকার, একটি সভ্যতার, একটি প্রজন্মের থেমে যাওয়া গল্প।
সরকারি নির্দেশনায় সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর উপকূলের হাজারো জেলে পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এই মানুষের জীবনে যে মৌলিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ছিল, তা আজও কেবলই প্রতীক্ষার নাম।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সরেজমিনে মহেশখালী উপকূলে দেখা যায়—উন্নয়নের নানা সূচকে দেশ এগোলেও এই জেলে পাড়াগুলো এখনো আটকে আছে দারিদ্র্য, ঋণ আর অনিশ্চয়তার এক কঠিন চক্রে।
নোঙর করা পুরোনো কাঠের নৌকার ওপর বসে ছিলেন জেলে মনু মিয়া । রোদে পোড়া মুখ, চোখে গভীর ক্লান্তি, তবু দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত শূন্যতা। তার জীবন যেন থমকে গেছে-যেখানে প্রতিদিনের সূর্য ওঠে, কিন্তু জীবিকার সূর্য আর ওঠে না।
তিনি ধীরে ধীরে বলেন,সাগর বন্ধ মানে আমাদের সব বন্ধ। আমরা তো অন্য কিছু জানি না। সাগরই আমাদের জীবন, সাগরই আমাদের মৃত্যু।তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু ভাগ্যের সঙ্গে মেনে নেওয়া এক দীর্ঘ যন্ত্রণা।
এই নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ঋণ। এনজিও, মহাজন, স্থানীয় দাদনদার সব জায়গা থেকেই ধার নিতে হয়। কিন্তু আয় না থাকলেও কিস্তির চাপ থামে না। বরং বাড়ে। দিন যত যায়, ঋণের বোঝা ততই ভারী হয়।এক জেলে বলেন, আজ মাছ নেই, কিন্তু কিস্তি আছে। আজ আয় নেই, কিন্তু সুদ আছে। এই হিসাব কেউ দেখে না।
শুধু জেলেই নয়, পুরো উপকূলীয় অর্থনীতি এই সময় থমকে যায়। মাছ পরিবহনকারী শ্রমিক, শুকটি তৈরির পল্লী, বরফ কল, আড়তদার—সবাই এক অদৃশ্য সংকটে স্থবির হয়ে পড়ে। যে উপকূল একসময় জীবনের গতি ছিল, সেখানে এখন জীবন যেন থেমে থাকা জল।
সরকার প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে সামুদ্রিক মাছের প্রজনন রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভার সবচেয়ে বেশি পড়ে যায় যাদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন এই সাগর-সেই জেলেদের ওপর।
মৎস্য খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশে ৫ লাখের বেশি জেলে সরাসরি সাগরনির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। কক্সবাজার উপকূলে এর একটি বড় অংশ বসবাস করে। একটি নৌকার সঙ্গে ৮ থেকে ১২ জন জেলের জীবন জড়িত। ফলে একটি নৌকা থেমে যাওয়া মানে একটি পুরো পরিবারের নয়, একটি পুরো সম্প্রদায়ের থেমে যাওয়া।
সরকারি ভিজিএফ সহায়তা থাকলেও জেলেদের অভিযোগ, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং অনেক সময় সবার কাছে পৌঁছায় না। কারও ভাগ্যে জোটে, কারও আবার অপেক্ষা শুধু তালিকার শেষ পাতায়।
মুনি মিয়ার কণ্ঠে সেই ক্ষোভ নয়, বরং এক নিঃশব্দ অভিমান-চাল দেয় ঠিকই, কিন্তু সেটা কি সংসার চালায়? বাচ্চাদের মুখে দুইদিনই যায়, তারপর আবার সেই একই চিন্তা।
ছোট মহেশখালীর জেলেপাড়া,মুদির চড়া, কুতুবজোম, বড় মহেশখালী মাতারবাড়ী, ধলঘাটা ঘুরে দেখা যায়-অনেক ঘরে দিনে একবেলা রান্না হয়। কোথাও শিশুর কান্না থেমে যায় অভুক্ত পেটের কারণে, কোথাও অসুস্থ মানুষ পড়ে থাকে চিকিৎসার অভাবে। স্কুলগামী শিশুদের চোখে স্বপ্ন থাকলেও, পেটের খালি বাস্তবতা সেই স্বপ্নকে ধীরে ধীরে ম্লান করে দিচ্ছে।
জেলে শাহ আলমের স্ত্রী চোখ মুছতে মুছতে বলেন-এই সময়টা আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। স্বামী ঘরে থাকলেও সে কিছু করতে পারে না। মনে হয় পুরো সংসারটা একসাথে থেমে গেছে।
উপকূলীয় অর্থনীতি শিক্ষার্থীর কাইমুল ইসলাম ছোটন বলেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এর সঙ্গে সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে এই জনগোষ্ঠী আরও গভীর দারিদ্র্যে নিমজ্জিত হবে। তাদের মতে, এই সময় পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা, ঋণের কিস্তি স্থগিত এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
তারা আরও বলেন, উপকূলীয় এই মানুষগুলো শুধু জেলে নয়-তারা একটি অর্থনৈতিক চক্রের প্রাণ। তাদের থেমে যাওয়া মানে পুরো স্থানীয় অর্থনীতির থেমে যাওয়া।
স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরও যখন উপকূলের মানুষ জীবিকার নিরাপত্তা খুঁজে ফেরে, তখন প্রশ্ন জাগে-উন্নয়নের আলো কি সত্যিই সবার ঘরে পৌঁছেছে? সূর্য যখন ডুবে যায় মহেশখালীর উপকূলে, তখন আকাশে রঙের খেলা থাকে, সাগরে থাকে ঢেউয়ের শব্দ, কিন্তু জেলেপাড়ায় থাকে এক গভীর নীরবতা। সেই নীরবতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা রহমত উল্লাহ যেন পুরো উপকূলের প্রতীক হয়ে যান।
নোঙর করা নৌকার পাশে বসে তিনি শেষবারের মতো বলেন-আমরা সাগরের মানুষ। সাগর ছাড়া আমাদের কিছু নেই। কিন্তু এই সাগর বন্ধ হলে, আমাদের জীবনটাই যেন থেমে যায়।