
খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন
সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও রাষ্ট্রচিন্তক।
আমাদের দেশ একবার স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সাল। সে স্বাধীনতা ছিল মূলত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। সেই দেশটির নাম ছিল পাকিস্তান। বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের পূর্ব অংশে, তাই এই অংশের নাম পূর্ব পাকিস্তান। ধর্মীয় কারণে মুসলমান ভাই ভাই হিসেবে যে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছিল, বাঙালি মুসলমানরা পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাই ভেবে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান বিনির্মাণে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করল। ভূখণ্ডগত অবস্থানসহ মন-মানসিকার দিক থেকে হাজার মাইল দূরে থাকার পরেও মুসলমান-মুসলমান ভাই ভাই! বাস্তবে তা পরিলক্ষিত হয়নি। কারণ, একটি রাষ্ট্র ভূখণ্ডগতভাবে এতই দূরত্বে অবস্থান ছিল যে স্থল ও জলসীমার মধ্যে সামান্য পরিমাণ সম্পর্ক ছিল না। অপর দিকে তাদের ভাষা, কৃষ্টি, কালচারের সঙ্গে বাঙালি বা বাংলাদেশিদের ভাষা, কৃষ্টি, কালচারের সামান্যই মিল ছিল। মুসলমান ভাই ভাই – তা বাস্তবে ছিল না, ছিল মুখে! তাদের মধ্যে ছিল জাত, পাত ও গোষ্ঠীগত আভিজাত্যের অহংকার। তারা নিজেদের শেখ-সৈয়দ-খান-মুঘল-পাঠানসহ বিভিন্ন ধরনের উপাধিতে ভূষিত করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করত এবং বাঙালিদের নীচু জাতের, নীচু মানের মানুষ হিসেবে গণ্য করত। তারা মনে করত, তারা উঁচা, লম্বা, দীর্ঘদেহি, নাক চিকন ও সুন্দর – তাদের সামনে বাঙালিরা কুৎসিত-কদাকার ও বেঁটে-কালো! বাঙালিরা তাদের চাকরবাকর এবং চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে পাকিস্তানের বসবাস করবে। সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলে বড়জোর কেরানি হিসেবে তারা আমরা চাকরি দেবে। কিন্তু বাঙালি বীরের জাতি; তারা লড়াই-সংগ্রাম করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বাঁচার মতো বেঁচে থাকতে বদ্ধপরিকর। পাকিস্তানের শোষণ, বঞ্চনা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে যে অসম্মানজনক অবস্থান – তাকে থেকে বেরিয়ে আসতে তারা প্রতিনিয়ত সোচ্চার ছিল। দীর্ঘ ২৩ বছরের অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা সর্বোপরি বাঙালিকে মানুষ মনে না করা! এর তীব্র প্রতিবাদে বাঙালিরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছিল, তখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা পরিপূর্ণভাবে আঘাত হানল। তাদের চ্যালেঞ্জ করে যখন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বাঙালিদের হাতে চলে এল, অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন সর্বকালের, সর্বযুগের, সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখনই তারা জলাতঙ্কগ্রস্ত পাগলা কুকুরের মতো হয়ে গেল। তারা বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কোনো বাঙালি হবে; তারা তা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। কিন্তু বাঙালি তার বীরত্ব, মানবিক মর্যাদা এবং বাঙালিত্বের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে অবিভক্ত পাকিস্তানের দায়িত্ব নেওয়ার পরিপূর্ণ যোগ্যতার সুযোগ গ্রহণ করেছিল। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদেরই উত্থান অস্ত্রের ভাষায় স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। আর আমাদের বাংলাদেশি কিছু লোক তাদের অস্ত্রের ভাষা স্তব্ধ করার পরিকল্পনার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। তাদের নাম হয়ে যায় রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তিবাহিনী, নিজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ প্রমুখ। মহান মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধে ৩০ লাখ লোক শহীদ হন এবং দুই লাখ মা-বোন ইজ্জত দেন (কোনো কোনো গাদ্দার, কুলাঙ্গার ও নরাধম বলে মুক্তিযুদ্ধ এমনি এমনি হয়ে গেছে)। রাষ্ট্র স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে রাষ্ট্রের পটপরিবর্তনের জন্য কারা দায়ী এবং এর সুফল কারা বর্তমানে ভোগ করছে – জাতির বিবেকের কাছে আজ এই প্রশ্ন?


