শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ন
Headline :
শাপলাপুর স্কুল মাঠে পান বাজার মাতারবাড়ী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অবহেলার অভিযোগ, প্রসূতি মায়ের মৃত্যু মাতারবাড়ী ইউপি নির্বাচনে মহিলা পদপ্রার্থী হিসেবে আলোচনায় সাবেক মেম্বার সামিমা বেগম (রহিমা) লোভের কটেজ ভাঙতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সোনাদিয়া সোনাদিয়ার বুকে অবশেষে রাষ্ট্রের পদচারণা: অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর কঠোর অভিযান বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী আজ উন্নয়নের আড়ালে স্বার্থের রাজনীতি: মহেশখালী রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান মহেশখালীতে ফজল বাহিনীর ৪ সদস্য আটক মহেশখালীতে অস্ত্র-গোলাবারুদসহ জলদস্যু জমির উদ্দিন আটক মহেশখালীতে জমি নিয়ে সংঘর্ষ: ভাইয়ের নেতৃত্বে হামলায় নারীসহ আহত ১২, থানায় এজাহার

ঢেউহীন দিনে জালের ভাষা-মহেশখালীর জেলেদের জীবনসংগ্রাম

শেখ আব্দুল্লাহ

প্রজনন মৌসুমে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকারের ঘোষিত ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলজুড়ে প্রায় ২৮ হাজার জেলে পরিবার বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। সমুদ্র এখন নীরব, নৌকা ঘাটে বাঁধা থাকলেও জেলেদের জীবন থেমে নেই,জীবিকার চাপ সামলাতে তারা ভিন্নভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

মহেশখালীর ছোট মহেশখালীর মুদির ছাড়া, কুতুবজোম, মাতারবাড়ী, ধলঘাটা ও গোরকঘাটা এলাকায় এখন এক ভিন্ন বাস্তবতা। যেখানে একসময় ভোর হলেই সাগরে নৌকা নামার প্রস্তুতি চলত, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে জাল বুননের দৃশ্য। পুরনো জাল মেরামত, ছেঁড়া অংশ সেলাই, সুতা গুছানো এবং নতুন জাল তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। অনেক পরিবারে নারী সদস্যরাও এই কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, সমুদ্রপাড়ের ছোট ছোট ঘর কিংবা উঠানে জেলেরা দলবেঁধে বসে কাজ করছেন। কেউ পুরনো জাল মেরামত করছেন, কেউ আবার ভবিষ্যতের জন্য নতুন জাল তৈরি করছেন। নিষেধাজ্ঞার এই সময়টিকে তারা একদিকে কষ্টের সময় হিসেবে দেখলেও অন্যদিকে প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগাচ্ছেন।

মুদির ছাড়া এলাকার জেলে মনু মিয়া বলেন,এই ৫৮ দিন আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। সমুদ্রে যেতে না পারায় কোনো আয় নেই। বাজার-সদাই, সন্তানদের পড়ালেখা, সংসারের খরচসবকিছুই থেমে গেছে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ধার করতে হয়। তারপরও আমরা বসে থাকি না। পুরনো জাল মেরামত করি, নতুন জাল বানাই, কারণ নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে যেন দ্রুত কাজে ফিরতে পারি।

কুতুবজোমের জেলে নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের একমাত্র জীবিকা মাছ ধরা। এই সময়টা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের। সরকার যে নিয়ম দিয়েছে তা আমরা মানি, কারণ মাছের বংশবিস্তার রক্ষা করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে আমাদের জীবনের কষ্টটা অনেক বেশি। সহায়তা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। অনেক সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু পাওয়া যায় না।

মাতারবাড়ীর জেলে ছৈয়দ আহমদ বলেন,আগে এই সময়টা অলসভাবে কাটত। এখন অন্তত জাল বানিয়ে কিছুটা সময় কাজে লাগাতে পারি। তবে আয় না থাকায় সংসারে চাপ থাকে সবসময়। নতুন জাল বানালে পরের মৌসুমে কিছুটা সুবিধা হয়, তাই এটা করতেই হয়।

ধলঘাটা এলাকার জেলে জসিম উদ্দিন বলেন,নিষেধাজ্ঞা মানা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে যায়। বাজারে জিনিসের দাম বেশি, আয় নেই। তাই জাল বুনে সময় পার করছি, কিন্তু চিন্তা তো থেকেই যায়।

গোরকঘাটার জেলে মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন,আমরা চাই সমুদ্রে মাছ বাড়ুক, ভবিষ্যতে ভালো দিন আসুক। তাই সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। কিন্তু এই সময়টা খুব কষ্টে কাটে, পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে অধিকাংশ পরিবারই ঋণ, মহাজনি দাদন কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক পরিবার আবার দৈনন্দিন খরচ কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

অনেক জেলে জানান, এই সময়ে শিশুদের পড়ালেখা, চিকিৎসা খরচ এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারও চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এক ধরনের আর্থিক চাপে দিন কাটাতে হচ্ছে উপকূলের পরিবারগুলোকে।

জেলেরা অভিযোগ করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া খাদ্য সহায়তা ও ভিজিএফ বরাদ্দ প্রকৃত জেলেদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না। তাদের দাবি, জেলে তালিকা হালনাগাদ না থাকা, মাঠপর্যায়ে তদারকির ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
একজন প্রবীণ জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,যারা সত্যিকারের জেলে, তাদের অনেকেই সহায়তা পায় না। আবার অনেক অযোগ্য লোকও তালিকায় ঢুকে যায়। এতে প্রকৃত জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিবছর একই সমস্যা দেখা দেয়।
আরেক জেলে জানানঅনেক সময় নাম থাকলেও সহায়তা পাওয়া যায় না। আবার যারা প্রভাবশালী, তারা সহজেই পেয়ে যায়। এতে আমাদের মতো গরিব জেলেরা আরও বেশি কষ্টে পড়ে।

এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা মৎস কর্মকর্তা শাহেদুল ইসলাম বলেন,সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন বাড়ানো। এই সময়ে জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা ও বিভিন্ন কর্মসূচি চলমান রয়েছে।সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আমরা জেলে তালিকা হালনাগাদ করার কাজ করছি। কোথাও অনিয়ম বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন,জেলেদের দুর্ভোগ আমরা বুঝি। তবে সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি যাতে কেউ অবৈধভাবে মাছ না ধরে এবং সরকারি সহায়তা সঠিকভাবে বিতরণ হয়। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করলেই হবে না, বরং প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা তৈরি, স্বচ্ছ সহায়তা বণ্টন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, মহেশখালীর প্রায় ২৮ হাজার জেলে এখন চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তবুও কষ্ট, অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার মাঝেও তারা ভবিষ্যতের আশায় জাল বুনে যাচ্ছেন,সমুদ্র আবার খুলে যাওয়ার অপেক্ষায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page